ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়লেও সক্ষমতা বাড়েনি

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও বরিশাল বিভাগের সংযোগ স্থাপন করেছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক। ২১১ কিলোমিটার মহাসড়কটি ফরিদপুর, মাদারীপুর ও বরিশাল হয়ে পটুয়াখালী সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে সে অনুপাতে সক্ষমতা বাড়েনি। দক্ষিণের প্রবেশদ্বার সড়কটির ওজন ধারণক্ষমতা এখনো পাঁচ টনই রয়ে গেছে। এর বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করলে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬২ বছরে প্রশস্ততা ১২ ফুট বেড়ে এখন ২৪ ফুট হয়েছে। সরু দুই লেনের মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হলেও নানা জটিলতায় আটকে রয়েছে প্রকল্পটি। এছাড়া মহাসড়কের বরিশাল, পটুয়াখালী, মাদারীপুর ও ফরিদপুর অংশে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। যানবাহন চলতে গিয়ে প্রায় সময় ঘটছে দুর্ঘটনা, বিকল হচ্ছে গাড়ি, সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজটের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে মহাসড়কটির গর্তে ইট, বালি আর সুরকি দিয়ে মেরামত শুরু করেছে সড়ক বিভাগ। তবে বৃষ্টিতে সেটি বেশি দিন টিকছে না। অবশ্য সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বলছে, টেকসই সড়ক সংস্কারের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদের অপেক্ষায় রয়েছে।
বরিশাল সওজ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের অর্ধশত স্পটে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। কার্পেটিং উঠে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। গৌরনদী, টরকী বাসস্ট্যান্ড, বরিশাল নগরীর গড়িয়ারপাড়, নথুল্লাবাদ, সাগরদী, রূপাতলী, নলছিটি, বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা অংশে মহাসড়কের অসংখ্য স্থানে বিটুমিন (পিচ) আর পাথরের কার্পেটিং উঠে কাদামাটির সড়কে পরিণত হয়েছে। যদিও সওজ বিভাগ ইট-বালি দিয়ে গর্ত ভরাটের কাজ অব্যাহত রেখেছে।

এ বিষয়ে বরিশাল সওজ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শাহীন মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা বৃষ্টির কারণে সড়কটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাথর-পিচ দিয়ে সড়কটি সংস্কার করা যাচ্ছে না। ইট দিয়ে গর্তগুলো ভরাট কাজ চলছে। বৃষ্টিপাত শেষ হলেই দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।’

একই অবস্থা মহাসড়কে মাদারীপুর অংশে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত মহাসড়কটির ৪৭ কিলোমিটার মাদারীপুর সড়ক বিভাগের আওতায়। মহাসড়কটির ভুরঘাটা, পাথুরিয়ারপাড়, কর্ণপাড়া, ভাঙ্গা ব্রিজ, তাঁতিবাড়ি, মোস্তফাপুর, ঘটকচর, সমাদ্দার, সানেরপাড়, রাজৈর, টেকেরহাট, দিকনগর, ছাগলছিড়া, বরইতলা, বাবনাতলা, ভাঙ্গাসহ বিভিন্ন স্থানেই ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। খানাখন্দের কারণে মাঝেমধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।

মাদারীপুর সওজ বিভাগের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ও মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করে। সড়ক সংস্কারে ব্যয় করা হলেও সেটি বেশিদিন টিকছে না। পদ্মা সেতু চালুর পর মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। সেই তুলনায় মহাসড়কের তেমন কোনো উন্নয়নই হয়নি।

এ ব্যাপারে মাদারীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে নিজস্ব অর্থায়নে ইট, সুরকি আর বালি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান মেরামত করা হচ্ছে। তবে টেকসই সংস্কারের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ অনুমোদন হলে মাহাসড়কে ভোগান্তি আর থাকবে না। এছাড়া যেসব কাজে ঠিকাদারের সময়সীমা রয়েছে, সেখানে ঠিকাদার মেরামত করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হলে স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রীরা যাতায়াত করতে পারবেন। এ ব্যাপারেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সড়ক বিভাগ।’

মহাসড়কের ফরিদপুর-ভাঙ্গা অংশে ৩০ কিলোমিটারেও ছোট-বড় খানাখন্দে ভরে গেছে। বৃষ্টির পানিতে গর্তগুলো ভরে যাওয়ায় বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করায় সময় লাগছে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ।

এ ব্যাপারে ফরিদপুর সওজ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যস্ততম মহাসড়কটি মেরামতের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে ৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার পর মে মাসে আরবিএল কোম্পানিকে টেন্ডারের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ইট, বালি, সুরকি ফেলে কিছু সংস্কার কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়া চার লেন প্রকল্পের জন্য এখনো জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হলেই মহাসড়কটির ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গা গোল চত্বর পর্যন্ত চার লেনের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমেজ অ্যান্ড ইনফরমেশনের তথ্য বলছে, ১৯৬০-৬৫ সালের মধ্যে নির্মিত সড়কটি প্রশস্ত ছিল মাত্র ১২ ফুট। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এটিকে ১৮ ফুট করে সড়ক বিভাগ। সর্বশেষ ২০১৮-১৯-এর দিকে আরো ছয় ফুট বাড়ালে এর প্রশস্ততা দাঁড়ায় ২৪ ফুটে। তবে দক্ষিণের প্রবেশদ্বার সড়কটির ওজন ধারণক্ষমতা এখনো পাঁচ টন। এর বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করলেই সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাস মালিক গ্রুপের নেতারা জানান, ৬২ বছরে সড়কের প্রশস্ততা বেড়েছে মাত্র ১২ ফুট। তাও আবার ধারণক্ষমতা পাঁচ টন। দীর্ঘ এ সময়ে এখানকার জনসংখ্যা ও যানবাহনও বেড়েছে। কিন্তু সড়কে সক্ষমতা বাড়েনি।

সার্বিক বিষয়ে বরিশাল সওজ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় ২১১ কিলোমিটার মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়। ২০১৮ সালে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা থাকলেও হয়নি। পুরো প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা।’